ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট : সত্য নাকি গুজব?

‘ফিলাডেলফিয়া’– নামটি হয়তো তোমরা কেউ কেউ শুনে থাকবে। এটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহর যা পেন্সিল্ভানিয়া অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত। হয়তো তোমরা বুঝে গেছ যে, এই আলোচনা নিশ্চয়ই ‘ফিলাডেলফিয়া’ নামক স্থানের কোনো পরীক্ষণের বিষয় নিয়ে। হ্যা, ঠিক তাই। আচ্ছা, তোমরা কি টেলিপোর্টেশনের নাম শুনেছ? যারা শুনোনি, তাদের জন্য বলছি, এটা হলো এমন একটা পদ্ধতি যার মাধ্যমে কোনো বস্তু মুহূর্তের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে বহু দূরের একটি জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে! ভাবছ, এ কি করে সম্ভব? যেহেতু, টেলিপোর্টেশন নিয়ে এখনো কোনো পরীক্ষণ সফল হয়েছে বলে জানা যায়নি, তাই এটিকে আপাতত অসম্ভব-ই বলা হয়ে আসছে। তবে ফিলাডেলফিয়াতে আজ হতে প্রায় ৭৫ বছর আগে যে পরীক্ষণ চালানো হয়েছিল তা কিন্তু কিছুটা ‘টেলিপোর্টেশন’ এর বিষয়টার মতোই! সময়টা ১৯৪৩ সাল। সমগ্র বিশ্ব তখন ২য় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করছে। আর এই ভয়ের মাত্রা কি করে আরো বাড়ানো যায়, সেটি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল বিশ্বের বড় ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো। ইউএস বা মার্কিন সেনাবাহিনীর এমন একটি গবেষণা প্রজেক্টের নাম ছিল “প্রজেক্ট রেইনবো”। রেইনবো মানে তো রংধনু। আকাশে রংধনু উঠলে সবাই তা দেখতে পায়, কিন্তু একই নামধারী প্রজেক্ট রেইনবো কিন্তু কিছু লোকজন ব্যতীত আর কেউ দেখতে পায়নি। বরং, এটি সম্পর্কে যাতে কেউ না জানতে পারে তার চেষ্টাই ছিল অন্যতম মূল বিষয়। অর্থাৎ ‘প্রজেক্ট রেইনবো’ এর নামের সার্থকতা এক্ষেত্রে খাটেনি বললেই চলে। আর এজন্যই হয়তো এই বিশাল পরিকল্পনাকে বিশ্ববাসী পরবর্তী সময়ে প্রজেক্ট রেইনবো হিসেবে না জেনে ‘ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট’ নামে বেশি জেনেছে। আচ্ছা, এবার মূল আলোচনায় আসি। ১৯৪৩ সালের ২৮ অক্টোবর ইউএস নেভির একটি জাহাজ ইউএস এল্ড্রিজ এর উপর পরীক্ষাটি চালানো হয়। পরীক্ষাটি করা হয় পেন্সিল্ভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া নেভাল শিপইয়ার্ডে। এইপরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি যুদ্ধজাহাজকে শত্রুপক্ষের রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। পরীক্ষাটি চালানো হয় একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে। তত্ত্বটি হলো আলবার্ট আইনস্টাইনের ‘ইউনিফাইড ফিল্ড অব থিওরি’। এই থিওরি অনুযায়ী যদি এমন একটি ক্ষেত্র তৈরী করা যায় যেখানে আলো প্রবেশ করবে না এবং আলো বের-ও হবে না, তবে সেখানে সময়কে স্থির করে ফেলা যাবে। কি? কিছুই বুঝতে পারলে না তো? সমস্যা নেই, কারণ শুধু তোমরাই নও, বরং পৃথিবীর বড় বড় বিজ্ঞানীরা-ও এই তত্ত্বের কোনো ব্যবহারিক প্রমাণ পাননি! অবশ্য, কেউ কেউ আবার এ তত্ত্বকে সত্য বলেও মেনে নিয়েছিলেন। কিছু গবেষকরা মনে করেন যে এই থিওরির মাধ্যমে বড় ইলেক্ট্রিক্যাল জেনারেটর ব্যবহার করে নির্দিষ্ট বস্তুর চারপাশে আলোকে বেঁধে ফেলা সম্ভব এবং এতে করে বস্তুটি অদৃশ্য হয়ে যাবে ( কারণ কোনো বস্তুর উপর যদি আলো না পড়ে বা পড়লেও প্রতিফলিত হয়ে ফিরে না আসে, তবে আমরা বস্তুটি আমরা স্বাভাবিকভাবেই দেখতে পাব না )। এটাকে সেনাবাহিনী বেশ গুরুত্ব দিয়েছিল এবং এজন্যই মূল গল্পের সৃষ্টি। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর প্রথমবার এ পরীক্ষা চালানোর চেষ্টা করা হয়। পরীক্ষণে তারা আরেকজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার আবিষ্কার ‘টেসলা কয়েল’ ব্যবহার করেছিল। পরীক্ষাটি আংশিক সফল হয়েছিল বলে শোনা যায়। এদিন জাহাজ ডেস্ট্রয়ার এল্ড্রিজ সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল এবং এর চারপাশে সবুজাভ ধোঁয়া দেখা গিয়েছিল । যখন এল্ড্রিজ পুনরায় দৃশ্যমান হয়, তখন জাহাজের ক্রুদের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। কেউ কেউ বমির ভাব অনুভব করে, আবার কেউ মারা-ও যায়। এরপর দেশটির নৌবাহিনী পরীক্ষাটি দ্বিতীয়বার চালানোর অনুরোধ করলে সরকার ২৮ অক্টোবর এটি দ্বিতীয়বার চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ধারনা করা হয়, ১৯৪৮ সালের গ্রীষ্মের ওই দিনে জাহাজটিকে সম্পূর্ণরূপে টেসলা কয়েল দিয়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাহির থেকে প্রচণ্ড শক্তি প্রবাহিত করা হয় যাতে আশেপাশে একটি একটি বিশাল তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং আলোকে বেঁধে ফেলা সম্ভব হয়। এ প্রজেক্টের ফলাফল অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের কাহিনীর মতো। বলা হয়ে থাকে, জাহাজটিতে শক্তি প্রবাহ করার সাথে সাথে জাহাজটি বন্দর থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। এমনকি, ৫ জন প্রত্যক্ষদর্শীর কথামতে, ঐ সময়ে জাহাজটিকে ভার্জিনিয়ার নরফোকে-ও দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, নরফোক ফিলাডেলফিয়া হতে প্রায় ২৭৭ মাইল দূরে অবস্থিত। এই বৃহৎ দূরত্বের নরফোকে জাহাজটিকে ১০ সেকেন্ডের মতো দেখা যায় আর সেই ১০ সেকেন্ডের জন্যই জাহাজটি ফিলাডেলফিয়া থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। এবার অদৃশ্য হওয়ার সময় নীল আলো দেখা গিয়েছিল। এরপর জাহাজটি আবার পরীক্ষার স্থলে দৃশ্যমান হয়ে উঠে। জাহাজটিতে অনেকজন ক্রু ছিলেন। জাহাজ পুনরায় ফিরে আসলে দেখা যায়, তাদের অনেকেই নিখোঁজ। কেউ কেউ বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েন, আবার কেউ কেউ পাগল হয়ে যান। সবচেয়ে আশ্চর্যকর কথা হলো এমন কিছু ক্রু নাকি এ ঘটনার পর অবিশ্বাস্য খমতা লাভ করেন, যেমন- কোনো কিছু ভেদ করে চলে যাওয়ার ক্ষমতা। আরো শোনা যায়, যেসব নাবিক এসব ঘটনার পর বেঁচে ফিরেছিলেন তারা নাকি ব্রেইনওয়াশের স্বীকার হন যার ফলে পরবর্তীকালে এই এক্সপেরিমেন্টের কথা তাদের আর মনে ছিল না। কিছু কিছু বিজ্ঞানী এ ঘটনাকে গুজব বলে উড়িয়ে দিলেও কেউ কেউ আবার জানিয়েছেন কড়া সমর্থন। তাদের মতে যদি এ ঘটনার ফলে মানুষগুলো মারা না যেত বা ক্ষতিগ্রস্থ না হতো তবে পরীক্ষাটিকে সম্পুর্ণভাবে সফল বলা যেত। এজন্য গবেষক কার্ল এম. এলেন বলেছিলেন,
“The experiment was a complete success but the men were complete failures.”
এই ঘটনাকে হয়তো তোমাদের কাছে টেলিপোর্টেশনের মতো বলে মনে হয়েছে। তবে কেউ কেউ এ ঘটনাকে টেলিপোর্টেশনের বদলে এক প্রকারের অবিচ্ছিন্ন পরিবহন ব্যবস্থা বলে মনে দাবি করেছেন। আচ্ছা বন্ধুরা, তোমাদের মতে এ পরীক্ষণ চালিয়ে নেয়া কি যুক্তিযুক্ত? তোমাদের মতে এটা যুক্তিযুক্ত কি না তা জানি না কিন্তু এটি তৎকালীন মার্কিন সরকারের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। তাই গোপনে চালানো পরীক্ষা আজীবন গোপনেই রাখতে চেয়েছে। এজন্য মার্কিন সরকার রহস্যময়ভাবে এ প্রজেক্ট বন্ধ করে দেয় ও পরীক্ষা সংক্রান্ত সকল যাবতীয় ডেটা ও প্রমাণাদি নষ্ট করে ফেলে! তবু কি করে যেন এত গোপনীয়তার ফাঁকেও এ ঘটনাটি ঠিকই প্রকাশ হয়ে গেছে। এই ঘটনা চাপা দিতে প্রজেক্টের সাথে সম্পৃক্ত একজন বিজ্ঞানী মরিস জেসাপ ১৯৫৬ সালে একটি অদ্ভূত চিঠি পান যাতে লেখা ছিল,
“১৩ বছর আগে মহাকর্ষ আর ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম নিয়ে ইউএস সরকারের গবেষণার ফলাফল ছিল ভয়াবহ। কাজেই এটি নিয়ে আপনি আর বাড়াবাড়ি করবেন না।”
তো বন্ধুরা, ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টে আসলে কি ঘটেছিল? এটা কিন্তু নিশ্চিত যে ‘ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট’ নামে আসলেই কিছু ছিল। তবে কি জাহাজটি সত্যিই অদৃশ্য হয়েছিল? আর কেনই বা সরকার প্রজেক্টটিকে বন্ধ করে দেয়? উত্তর আজ অজানা থাকলেও একদিন হয়তো ঠিকই জানা যাবে। আর ততদিনে হয়তো টেলিপোর্টেশনের মত বিষয় কারো কাছে নতুন কিছু বলে মনে হবে না !

লেখকঃ শাহবাজ আহমেদ

Comments

Popular Posts