হারিয়ে যাওয়া মেগালোডন
আমাদের এই পৃথিবীর বয়স আজ হতে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন বছর। এত বিশাল সময়ের মধ্যে অগণিত প্রাণীর আবির্ভাব ঘটেছে। এ তালিকায় মানুষ বেশ নতুন সংযোজন। বিজ্ঞানীদের ধারণামতে, প্রায় ২ লক্ষ বছর আগে মানুষের জীবনের সূচনা হয়। আমরা সবাই জানি, পৃথিবীতে মানুষ আসার পূর্বেই অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এসব প্রাণী বিলুপ্ত না হলে আবার মানবজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারত। নিশ্চয়ই তোমাদের সবার এখন ডাইনোসরের কথা মনে পড়েছে। সত্যিই ডাইনোসর বেশ বিশালদেহী এবং হিংস্র প্রাণী ছিল। কেউ কেউ মনে করে, ডাইনোসরই হয়তো পৃথিবীতে এ যাবৎ বসবাস করা সবচেয়ে বড় প্রাণী। কিন্তু এটা একটা হাস্যকর ভুল ছড়া আর কিছুই নয়। কারণ, সবচেয়ে বড় প্রজাতির ডাইনোসরের (সাউরোপড আর্জেন্টিনোরাস) দৈর্ঘ্য একটি সাধারণ নীলতিমির দৈর্ঘ্যের চেয়ে অনেক কম। এর ভর-ও একটি নীলতিমির ভরের অর্ধেকের চেয়ে সামান্য বেশি। অর্থাৎ, এটা মানতে আপত্তি নেই যে সবচেয়ে বড় প্রাণী হলো নীলতিমি। আচ্ছা, নীলতিমি তো সবচেয়ে বড়, তাহলে কি এটাই সবচেয়ে হিংস্র? হাতি-ও তো আকারে বিশাল, কিন্তু একটা হাতি কখনোই একটা বাঘের মতো হিংস্র নয়। তার মানে, বড় হলেই হিংস্র হতে হবে- এমন বলার উপায় নেই। তাই নীলতিমি-ও সবচেয়ে হিংস্র নয়। তাহলে সেই অস্বাভাবিক হিংস্র প্রাণীটি কে? এ প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভেবেই চলেছেন। তাদের অনেকেই এখন বিশ্বাস করেন, মেগালোডন-ই হলো এ পর্যন্ত পৃথিবীতে বসবাস করে আসা সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী।
মেগালোডন? এ আবার কে? মেগালোডন (Megalodon) নামটির অর্থ হল Giant / Big Tooth বা বড় দাঁত। মেগালোডন হলো সবচেয়ে বড় প্রজাতির হাঙর, তবে মূল বিষয় হলো এটি এখন আর বেঁচে নেই বলে ধারণা করা হয়। আজ হতে প্রায় ২৩ মিলিয়ন বছর আগে পূর্ব মায়োসিন যুগের সময় এদের আবির্ভাব ঘটে এবং ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে পাইলোসিন যুগের শেষে এরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেবল এন্টার্কটিকা বাদে অন্য সকল মহাদেশের নিকটে এর ফসিল পাওয়া গেছে। এর ফসিলের বেশিরভাগই দাঁতের। আর এর দাঁতের বিশালতার জন্যেই হাঙরটির নাম দেওয়া হয় Megalodon বা বড় দাঁত! Megalodon শুধু সবচেয়ে অড় হাঙরই ছিল না, বরং সবচেয়ে বড় মাছ-ও ছিল। তোমরা ভাবতে পার, সবচেয়ে বড় তো নীলতিমি। তাহলে আমি Megalodon কে বড় বলছি কেন? আসলে নীলতিমি সমুদ্রে বসবাসকারী একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী যাকে মাছের সাথে তুলনা করা অযৌক্তিক। অর্থাৎ, নীলতিমি মাছ নয় এবং এজন্যই Megalodon-ই এ পর্যন্ত বাস করে আসা সবচেয়ে বড় প্রজাতির মাছ। এর আকার- আকৃতি নিয়ে একটু পরে আলোচনা করছি। এখন সংক্ষেপে Megalodon এর শ্রেণীবিন্যাসগত অবস্থান জেনে নেয়া যাক।
| রাজ্য | Animalia |
|---|---|
| পর্ব | Chordata |
| শ্রেণী | Chondrichthyes |
| বর্গ | Lamniformes |
| পরিবার | Otodontidae |
| গণ | Carcharocles |
| প্রজাতি | Carcharocles megalodon |
Megalodon এবং Great White Shark এর দাঁতের আকৃতি ত্রিকোণাকার, যদিও আকারে Megalodon এর দাঁত তুলনামূলকভাবে বড়। ধারণা করা হয়, এই ২ প্রজাতির হাঙরের মধ্যে কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একটি শিশু Megalodon এর দৈর্ঘ্য হতো কমপক্ষে ৬.৬ ফুট বা ২ মিটারের কাছাকাছি (যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উচ্চতা-ও অনেক সময় এর চেয়ে কম হয়)। এই হাঙর প্রাপ্তবয়স্ক হলে ১৮ মিটার বা ৫৯ ফুট দৈর্ঘ্য লাভ করে। অবশ্য, হাঙরদের মধ্যে এই দোইর্ঘ্য সর্বাধিক হলেও নীলতিমির তুলনায় তা কিছুটা কম। মেগালোডন হাঙর তার একটি কামড়ে ১,১০,০০০ থেকে ১,৮০,০০০ নিউটন বল প্রয়োগ করতে পারত। এর দাঁত ছিল মোটা, বিশাল ও ধারালো যা এর শিকারের হাঁড় ভাঙার জন্য যথেষ্ট ছিল।

মজার বিষয় হল, নারী মেগালোডন দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে পুরুষ মেগালোডনের তুলনায় বড় হত যা কিনা ২ গুণ পর্যন্ত হতে পারত! একেকটি প্রাপ্তবয়স্ক মেগালোডনের ভর কমপক্ষে ৩০ মেট্রিক টন থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ মেট্রিক টন পর্যন্ত হত। মায়োসিন যুগে এই হাঙর বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রে ছড়িয়ে যেতে শুরু করে। এই বিস্তৃতির ভিতরে ক্যারিবিয়ান ও মেডিটেরানিয়ান সাগর, বঙ্গোপসাগর, ক্যালিফোর্নিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্রতীর, উত্তর ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যাণ্ড ও পূর্ব এশিয়া উল্লেখযোগ্য। ‘বঙ্গোপসাগর’ নামটি শুনে নিশ্চয়ই তোমাদের চোখ কপালে উঠে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে বঙ্গোপসাগরের নিকটে মেগালোডনের দাঁতের ফসিল পাওয়া গেছে যা এ স্থানে Megalodon এর পূর্ব অস্তিত্ব নির্দেশ করে। তাছাড়া আজকের বঙ্গোপসাগর আর মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের বঙ্গোপসাগর তো আর এক নেই। এখন প্রশ্ন হলো, একটি প্রজাতির হাঙর কিভাবে এত রকম স্থান বা এত রকমের পানিতে বিচরণ করতে পারল? একটি মেরু ভাল্লুককে যদি আমাদের সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে চোখ বন্ধ করে বলা যায় – “এর মৃত্যু হতে বেশি দেরি নেই!” অর্থাৎ, মেরু ভাল্লুকের জন্য সুন্দরবনের আবহাওয়া অত্যন্ত প্রতিকূল। কিন্তু এই প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে মেগালোডন কিভাবে এত রকম পানির মাঝে বিচরণ করতে পেরেছে? মেগালোডন এর জন্যও তো বিভিন্ন অঞ্চলের পানি বিভিন্ন রকম হয়ে প্রতিকূলতা সৃষ্টি করতে পারত। আসলে মেগালোডন উচ্চ অভিযোজন ক্ষমতার অধিকারী ছিল। ধারণা করা হয়, এটি মডার্ণ গ্রেট হোয়াইট শার্কের মতো বিশেষ উপায়ে নিজের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করত। এরা উভয়ই অন্যান্য মাছের মতো একেবারে শীতল রক্তের প্রাণী নয়। এরা তাদের সাঁতার কাটার পেশি দিয়ে তাপ উৎপাদন করত এবং এই তাপ শীতল পানির তাপমাত্রার চেয়ে মেগালোডন এর শরীরের প্রতিটি অংশের তাপমাত্রা বেশি রাখতে সাহায্য করত। এই অভিযোজন ক্ষমতাই হয়তো তাদের ঠাণ্ডা পানিতেও শত্রু দমন বা খাদ্য শিকারে সাহায্য করেছে। অবশ্য, বড় এবং প্রাপ্তবয়স্ক মেগালোডনদের তেমন কোনো শত্রু ছিল না। কারণ সেসময়ের কোনো সামুদ্রিক প্রাণী মেগালোডন এর ন্যায় শক্তিশালী ও হিংস্র ছিল না। কিন্তু কখনো কখনো বিশালাকার হাতুড়ি মাছেরা ছোট বা বাচ্চা মেগালোডনদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াত। মেগালোডনরা প্রায় সময় তিমি শিকারে বের হতো। বিশাল বিশাল তিমিরাও এর কাছে ধরাশায়ী হয়ে যেত। তারা খাদ্য হিসেবে যেকোনো মাছ, ডলফিন, সামুদ্রিক সিল, বালিন হোয়েল, স্পার্ম হোয়েল, কিলার হোয়েল ইত্যাদি শিকার ও ভক্ষণ করত।
তোমাদের মনে হতে পারে- এতদিন তো শুধু ডাইনোসর নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি। কিন্তু একটা ডাইনোসর তো একটা মেগালোডন এর কাছে কিছুই না! এরকম ভাবলে তেমন কোনো ভুল হবে না। কিন্তু ডাইনোসর আর মেগালোডন এর তুলনা করা একদমই অযৌক্তিক। কারণ, ডাইনোসর স্থলজীবী হলেও মেগালোডন জলজীবী। তাছাড়া তারা কখনোই পৃথিবীতে একসাথে বসবাস করেনি। তাদের উভয়ের আবির্ভাবকালের পার্থক্য ছিল ৪০ মিলিয়ন বছর। অর্থাৎ, একটি আবির্ভাবের বহু পূর্বেই অন্যটি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।
আবার, ১৯৮১ সালে স্টিড নামক এক ব্যাক্তি কয়েকজন জেলের সাথে কথা বলে জানতে পারেন তারা মাছ ধরার সময় একটি বিশালাকৃতির হাঙর দেখে বেশ ভয় পেয়েছে যার কারণে তারা ব্রাউটন আইল্যাণ্ডের সেই জায়গায় বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করতে যাচ্ছে না। তারা দাবি করে, তারা অবিশ্বাস্য আকারের একটি হাঙর দেখেছে যা পানির গভীরে মাছ ধরার পাত্র আর জাহাজের নোঙর ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছিল। উল্লেখ্য যে, সেই পাত্রগুলোর ব্যাস ছিল ৩ ফুটের বেশি এবং তা ছিল অত্যন্ত ভারী যা সরানো মোটেই সহজ কাজ নয়। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন এটা লম্বায় ১১৫ ফুটের মতো হবে। আবার হাঙরটি যেখানে দেখা গিয়েছিল, সেখানকার পানি ফুটছিল। তাছাড়া জেলেরা সবাই নিশ্চিত যে সেটা কোনো তিমি নয়, বরং কোনো হাঙর কেননা এর রং ছিলে ফ্যাকাশে সাদা।
কাহিনী এখানেই শেষ নয়। ১৯৬০ এর দশকে এক জাহাজ সাগরের মাঝে ইঞ্জিন ঠিক করার জন্য নোঙর ফেলেছিল। জাহাজটি ছিল ৮৫ ফুট উঁচু। থেমে থাকা জাহাজের নাবিক ও ক্রুরা হঠাৎ দেখতে পায়, একটি সাদা রঙের হাঙর তাদের জাহাজের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে যার উচ্চতা ৮৫ ফুট উঁচু জাহাজের প্রায় সমান! যদি এসব কথা সত্যি হয়, তাহলে মেগালোডন এর বর্তমান অস্তিত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। কিন্তু এটা কি আদৌ সম্ভব? বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখলে এমন প্রাণী পাওয়া খুবই দুষ্কর যারা মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে এসেও এখনো টিকে আছে। ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে যদি মেগালোডন বিলুপ্ত হয়েই যায়, তাহলে উপরের কথা-বার্তাগুলোর অর্থ কি? আর যদি কৌতহলী দৃষ্টি থেকে মেনে নেয়াই হয় সত্যিই মেগালোডন ফিরে এসেছে, তবে মাঝখানের এত বছর এটি ছিল কোথায়? অনেকে মনে করেন, মেগালোডন এখনো আছে এবং তা বাস করছে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের অনির্ধারিত গভীরতায়। আবার অনেকের মতে এটা মেগালোডন এর কোনো উত্তরসূরি প্রজাতি।
কিছু রহস্য আজীবন রহস্যই থেকে যায়। অবশ্য, রহস্যের ভেদ করাই মানুষের কাজ। তাই আশা করা যায়, অতি শীঘ্রই এ রহস্যের জট খোলা সম্ভব হবে। আর ততদিন পর্যন্ত জাহাজে যাতায়াতের সময় খেয়াল রাখবে তোমার জাহাজ থেকে কোনো ফ্যাকাশে সাদা রঙের বিশালদেহী হাঙর দেখা যাচ্ছে না তো!
আরেকটা মজার বিষয় এখনো বাকি রয়ে গেছে। সেটা হল- মেগালোডন এর উপর ভিত্তি করে ২০১৮ সালে একটা মুভি বানানো হয়েছে যার নাম “The Meg”। চাইলে দেখে নিতে পারো সেই মুভিটি।




Comments
Post a Comment